আম্রপালি আমের জাতটি ১৯৭১ সালে উদ্ভাবন করেন ভারতীয় কৃষিবিজ্ঞানী পীযূষ কান্তি মজুমদার। দেশটির কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের এই বিজ্ঞানী উত্তর ভারতের বিখ্যাত আমের জাত দোসেরি ও দক্ষিণ ভারতের নীলমের সংকরায়ণের মাধ্যমে দুটি জাতের আম উদ্ভাবন করেন—আম্রপালি ও মল্লিকা।
আম গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, দোসেরির ফুলের পুরুষ পরাগ ও নীলমের স্ত্রী পরাগ মিলে হয়েছে আম্রপালি। আর দোসেরির স্ত্রী ও নীলমের পুরুষ পরাগ মিলে হয়েছে মল্লিকা জাতের আম।
প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত গায়িকা ও নর্তকী আম্রপালির নামে আম্রপালি জাতের আমের নামকরণ হয়েছে। তিনি আমবাগানে জন্মেছিলেন। তাই তাঁর নাম রাখা হয়েছিল আম্রপালি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি অ্যান্ড বুড্ডিস্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক বিমান চন্দ্র বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ভারতের বৈশালী নগরের (এখনকার বিহারে নগরটি ছিল) নর্তকী ছিলেন আম্রপালি। তিনি শেষজীবনে তাঁর সব ধনসম্পদ বিলিয়ে দিয়ে গৌতম বুদ্ধের শিষ্যা হয়ে যান। তাঁর নামে নামকরণের পর আম্রপালি জাতের আমের প্রথম চারা রোপণ করা হয় পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার চাকদহে।
বাংলাদেশে ভারত থেকে আম্রপালি জাতের আমের চারা এনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক (১৯৯৬-২০০১) এম এনামুল হকের দাবি, ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) একজন কর্মকর্তা ভারতে গিয়ে আম্রপালির কিছু চারা নিয়ে আসেন। তিনি (এনামুল হক) তখন উপপরিচালক হিসেবে ডিএইতে কর্মরত। তিনি কয়েকটি চারা নিয়ে খামারবাড়িতে রোপণ করেন।
এনামুল হক আরও বলেন, তিনি ১৯৯৬ সালে ডিএইর মহাপরিচালক হয়ে আম্রপালির প্রসারে উদ্যোগী হন। তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদে দেশে অন্তত ২০ লাখ আম্রপালির চারা রোপণ করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ১৯৯৬ সালে আম্রপালি জাতকে বারি আম-৩ নামে অবমুক্ত করে। কৃষিবিদেরা জানিয়েছেন, বিদেশি জাতের দেশি সংস্করণের এই রীতিকে বলা হয় পরিচিতি বা ইন্ট্রোডাকশন। আম্রপালি অবমুক্তের পেছনে ছিলেন কৃষিবিদ কাজী বদরুদ্দোজা।
সবচেয়ে মিষ্টি আম্রপালি
আম্রপালি খুবই মিষ্টি আম। আমের মিষ্টতা নির্ধারণ করা হয় ব্রিকস মিটার অনুযায়ী। ডিএইর ‘বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের পরিচালক মো. মেহেদী মাসুদ বলেন, আম্রপালির মিষ্টতার মাত্রা ২৬–এর মতো। এটা সর্বোচ্চ। কাছাকাছি অবস্থানে আছে গৌড়মতী ও হিমসাগর।
আম্রপালির দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো এই আম অন্য আমের চেয়ে বেশি সময় টেকে। মানে হলো সহজে পচে যায় না। আর মৌসুমের সময় বেশি সময় ধরে এই আম পাওয়া যায়। ডিএইর কর্মকর্তারা বলছেন, জুনের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের শুরু পর্যন্ত এই আম বাজারে মেলে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও আমবিশেষজ্ঞ এম এ রহিম বলেন, আম্রপালি আমগাছে পুরুষ ফুল এবং উভয় লিঙ্গের ফুল ধরে। যে গাছে উভয় লিঙ্গের ফুল বেশি ধরে, সে গাছে ফলন বেশি হয়। আম্রপালিতে উভয় লিঙ্গের ফুল ধরার পরিমাণ ৮০ শতাংশের বেশি। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের প্রচলিত আমগুলোর মধ্যে আম্রপালির খাদ্যাংশ সবচেয়ে বেশি, ৭২ শতাংশের মতো।’

