গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফল আম। বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয় ফলের প্রসঙ্গ উঠে এলে নিঃসন্দেহে আমের অবস্থান হবে শীর্ষে। এত জনপ্রিয় ফলটির জন্মস্থান জানা স্বাভাবিক কারণেই বেশ প্রাসঙ্গিক। আমের উৎপত্তিস্থল বা জন্মভূমি নিয়ে ঐতিহাসিকভাবে এখন পর্যন্ত যে দেশগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম সেই আদি ভূমি, যেখানে বুনো জাতের আমগাছ প্রথম দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘দ্য ম্যাঙ্গো’ (সম্পাদনা আর ইলিটজ) বইয়ে আমের আদি নিবাস সম্পর্কে একটা বর্ণনা আছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘সাধারণ বুনো আমগাছের রেকর্ড পাওয়া যায় বাংলাদেশ (পার্বত্য চট্টগ্রাম), উত্তর–পূর্ব ভারত ও মিয়ানমারে। এটি প্রশ্নাতীতভাবে আসামের চির সবুজ উপত্যকার আদি বা দেশীয় ফল।’
আমের উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশ—এটি বুঝতে আরও সহজ হবে যদি আমরা ফলবিজ্ঞানীদের এই গবেষণামূলক তথ্যের সঙ্গে আরেকটি বাস্তবতা যোগ করি। আর এইচ স্নেইড হ্যাচিনসন বিংশ শতাব্দীর একেবারে গোড়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি ‘অ্যান অ্যাকাউন্ট অব দ্য চিটাগাং হিলট্রাক্টস’ নামে একটি গ্রন্থ লিখেছেন ১৯০৬ সালে। বইটির ৬০ ও ৬১ পৃষ্ঠায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বুনো আম সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে এভাবে—বনে পঞ্চাশ বা তার বেশি প্রজাতির গাছ রয়েছে। এসব গাছের ফল ভক্ষণযোগ্য এবং স্বাদ বিবেচনায় অধিকাংশ ফল খাওয়ার অনুভূতিও অসম্ভব আনন্দের। এর মধ্যে সেরাদের তালিকায় আছে ব্যাশ আম বা বুনো আম। এটি মিষ্টি স্বাদের একটি ক্ষুদ্র ফল।’ ক্ষুদ্রাকৃতির মিষ্টি স্বাদের এই বুনো আমসহ হয়তো আরও অনেক জাতের বুনো আম ছিল বা আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে, যেগুলোর খোঁজ আমাদের জানা নেই।
রামায়ণের অনেক শ্লোকে আমের উল্লেখ রয়েছে। বৌদ্ধদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আম্রপল্লবের ব্যবহার হয়ে আসছে দুই হাজার বছর ধরে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৭ সালে মহাবীর আলেকজান্ডার সিন্ধু উপত্যকায় এসে আমবাগান এবং আমের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ফল হচ্ছে আম। এই ফল ভারতের বৈদিক ধর্মের সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পর্কিত। হিন্দু পুরাতত্ত্বের অনেক কাহিনিতে আমের প্রসঙ্গ রয়েছে। প্রাচীন সংস্কৃত ভাষায় আমের মুকুল, মুকুলের গন্ধ, পরিপক্ব আম, আম্রকুঞ্জ—এসব নিয়ে অনেক কাব্য আছে।
আমগাছ, আম্রকানন, আম—এ নিয়ে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রাচীনকাল থেকে যত কাব্য, সাহিত্য ও শিল্প সৃষ্টি হয়েছে, তেমনটি পৃথিবীর অন্য কোনো ফল নিয়ে হয়নি। ভারতবর্ষের প্রাচীন সাহিত্য ও পুরাণে বিশেষ করে রামায়ণ ও মহাভারতে আম্রকানন, আম্রকুঞ্জ ইত্যাদি শব্দ একাধিকবার ঘুরেফিরে এসেছে। মহাকবি কালিদাস তাঁর মেঘদূত কাব্যে মেঘমালাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন যে পর্বতের সঙ্গে, সেটির নাম ছিল ‘আম্রকূট’। ‘শকুন্তলা’ নাটকের ষষ্ঠ সর্গে আম্রমঞ্জরির উল্লেখ রয়েছে। মহাকবি কালিদাস আম্রমুকুলকে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রেমের দেবতা মন্মথ বা মদনের পঞ্চশরের একটি শর হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

